লবণাক্ত পানি হতে লবণের স্ফটিক প্রস্তুতকরণ (পাঠ ১০-১২)

মিশ্রণ - বিজ্ঞান - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.7k

আমরা পূর্বের অনুচ্ছেদে পরিস্রাবণ ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পরিষ্কার লবণ প্রস্তুত প্রণালি দেখেছি। ঐ প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত লবণ কিন্তু দানাদার ছিল না, ছিল লবণের স্তর যা মূলত অদানাদার লবণ। এখন আমরা লবণাক্ত পানি হতে দানাদার লবণ অর্থাৎ লবণের স্ফটিক প্রস্তুতকরণের কৌশল দেখব।

কাজ: লবণাক্ত পানি হতে লবণের স্ফটিক প্রস্তুতকরণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ ১টি বিকার, চামচ, নাড়ানি, ত্রিপদি স্ট্যান্ড, তারজালি, ফানেল, ফিল্টার কাগজ, রিং যুক্ত স্ট্যান্ড, কিছু অপরিষ্কার লবণ ও পানি।
পদ্ধতি: একটি বিকারে ২০০ মিলিলিটার পানি ও ৫০ গ্রাম অপরিষ্কার লবণের একটি মিশ্রণ তৈরি করে পরিস্রাবণের মাধ্যমে পরিষ্কার লবণ-পানির দ্রবণ অর্থাৎ লবণাক্ত পানি বানাও। এবার লবণাক্ত পানি একটি বিকারে নিয়ে বিকারকে ত্রিপদি স্ট্যান্ডের উপর রাখা তারজালির উপর বসিয়ে তাপ দিতে থাক। তাপ দিতে দিতে বিকারে লবণাক্ত পানির আরতন প্রায় অর্ধেকে পরিণত হলে তাপ দেওয়া বন্ধ কর। অতঃপর বিকারে একটি ঢাকনা দিয়ে ঠাণ্ডা করার জন্য রেখে দাও।

বিকারটি ঠাণ্ডা হওয়ার পরে তোমরা কি কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ? বিকারের তলায় বা গায়ে লবণের দানা জমা হতে শুরু করেছে। এই দানাযুক্ত লবণই হলো লবণের স্ফটিক। লবণের স্ফটিক তৈরির এই পদ্ধতিকে বলা হয় স্ফটিকীকরণ। অনেক সময় লবণাক্ত পানি হতে স্ফটিক পাওয়ার জন্য এতে দুই একটি লবণের দানা বাইরে থেকে যোগ করতে হয়। এতে যোগকৃত লবণ দানাকে ঘিরে খুব দ্রুত দানাদার লবণ জমা হতে থাকে।

লবণাক্ত পানি হতে বিশুদ্ধ পানি প্রস্তুতকরণ

লবণাক্ত পানি অথবা যেকোনো মিশ্রণ হতে বিশুদ্ধ পানি প্রস্তুত করার একটি সহজ উপায় হচ্ছে পাতন পদ্ধতি, যার জন্য প্রয়োজন একটি পাতন যন্ত্র। চিত্র-৮.৬ এ একটি পাতন যন্ত্র দেখানো হলো:

পাতন যন্ত্রটির বাম পাশে রয়েছে পরীক্ষাধীন লবণাক্ত পানি নেওয়ার জন্য একটি গোলতলী ফ্লাস্ক (১)। এর সাথে সংযুক্ত আছে একটি শীতক (condenser) (২) যার ভিতরে একটি সরু কাচের নল (৩) বসানো আছে এবং ঐ নলের চারপাশে ঠান্ডা পানির প্রবাহের জন্য একটি প্রবেশ নল (৪) ও একটি নির্গমন নল (৫) আছে। আর ডান পাশে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করার জন্য আছে আরেকটি গ্রাহক ফ্লাস্ক (৬)। এছাড়া পানিতে তাপ দেওয়ার জন্য একটি বৈদ্যুতিক হিটার (৭) আর তাপমাত্রা মাপার জন্য বাম পাশের ফ্লাস্কের উপরে থার্মোমিটার (৮) বসানোর জন্য ও শীতকের সাথে যুক্ত করার জন্য একটি কাচের এডাপটার (৯) রয়েছে। এছাড়া ফ্লাস্ক দুটি ও শীতককে সঠিকভাবে ধরে রাখার জন্য স্ট্যান্ড (১০) ও ক্ল্যাম্প (১১) রয়েছে। এবার দেখা যাক পাতন যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে।

কাজ: লবণাক্ত পানি হতে বিশুদ্ধ পানি প্রস্তুতকরণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: ১টি পাতন যন্ত্র, ৫০০ মিলিলিটার লবণাক্ত পানি।
পদ্ধতি: চিত্র ৮.৬ এর মতো করে পাতন যন্ত্রটি সাজিয়ে গোলতলী ফ্লাস্ক (১) এ লবণাক্ত পানি নাও। পাতন যন্ত্রটির পানি প্রবেশের নলটি (৪) একটি পানির ট্যাপের সাথে সংযুক্ত করে পানির প্রবাহ চালু কর। পানি নির্গমণের নলের সাথে একটি প্লাস্টিকের পাইপ যুক্ত করে বেসিনে রাখ। এবার বৈদ্যুতিক হিটার দিয়ে ফ্লাস্কে তাপ দিতে থাক। বৈদ্যুতিক হিটারের ব্যবস্থা না থাকলে স্পিরিট ল্যাম্প বা অন্য যেকোনো উপায়ে তাপ দেওয়া যেতে পারে। পাতন যন্ত্রের থার্মোমিটারে তাপমাত্রা খেয়াল কর। বাষ্পীভূত পানি শীতকের সরু নলের মধ্য দিয়ে গ্রাহক ফ্লাস্কে (৬) জমা হতে শুরু করলে অপেক্ষা করতে থাক। গোলতলী ফ্লাস্ক (১) এ পানির পরিমাণ তিন-চতুর্থাংশ কমে গেলে তাপ দেয়া বন্ধ কর।

তাপ দেয়ার পর কী ঘটে? থার্মোমিটারের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি ফুটতে শুরু করে ও বাষ্পে পরিণত হয়। উক্ত বাষ্প শীতকে প্রবেশ করলে ঠাণ্ডা হয়ে তা তরলে পরিণত হয়। বাষ্প তরলে পরিণত হওয়ার এ প্রক্রিয়াকে ঘনীভবন বলে। ঘনীভূত পানি ফোঁটায় ফোঁটায় গ্রাহক ফ্লাস্কে জমা হতে থাকে। এই জমা হওয়া পানিই বিশুদ্ধ পানি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পানির কোনো মিশ্রণ থেকে বিশুদ্ধ পানি তৈরি করতে আমাদের দুটি প্রক্রিয়া প্রয়োগ করতে হয়। এদের একটি হলো বাস্পীভবন আর অন্যটি ঘনীভবন। তোমরা কি এখন সমুদ্রের পানি থেকে বিশুদ্ধ পানি তৈরি করতে পারবে?

সাসপেনসন ও কলয়েড

কাজ: সাসপেনসন তৈরি।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: ১টি কাচের গ্লাস, চামচ, কাদামাটি ও পানি।
পদ্ধতি: কাচের গ্লাসের তিন-চতুর্থাংশ ভরে পানি নাও। ১ চামচ পরিমাণ কাদামাটি গ্লাসে যোগ করে খুব ভালোভাবে নাড়া দাও। মিশ্রণটিকে কিছুক্ষণের জন্য রেখে দাও।

কী দেখতে পাচ্ছ? প্রথমে পুরো মিশ্রণটি ঘোলা দেখাচ্ছে। রেখে দেওয়ার পর তুলনামূলকভাবে ভারি মাটির কণাগুলো গ্লাসের তলায় জমা হচ্ছে, তবে কিছু কিছু মাটির কণা যেগুলো খুব হাল্কা ও ছোটো ছোটো তারা পানিতে ভাসমান অবস্থায়ই থাকছে আর মিশ্রণটি অল্প ঘোলাটে দেখাচ্ছে। আরও কিছু সময় মিশ্রণটি কোনো নাড়াচড়া না করলে, মিশ্রণটিতে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ কি? হ্যাঁ, মাটির আরও কিছু ক্ষুদ্র কণা তলায় জমা পড়ছে তবে পানি পুরোপুরি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না, কারণ কিছু কিছু ক্ষুদ্র কণা তখনও পানিতে ভাসমান অবস্থায় থেকেই যাচ্ছে। মাটি ও পানির এ জাতীয় মিশ্রণ যা রেখে দিলে উপাদানসমূহ আংশিক আলাদা হয়ে যায় তাকেই সাসপেনসন বলে। একইভাবে, চক মিহি করে গুঁড়া করে বা আটা পানিতে যোগ করে ভালোভাবে নাড়া দিলে যে মিশ্রণ পাওয়া যায় সেগুলোও সাসপেনসন। আমরা বাড়িতে যে সকল এন্টিবায়োটিক বা এন্টাসিডের সাসপেনসন ব্যবহার করি, সেগুলোও রেখে দিলে আংশিক আলাদা হয়ে যায় ও ঔষধের বোতলের নিচে তলানি পড়ে যায়। তাই ঔষধ সেবনের পূর্বে বোতল ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিতে হয়।
এবার তোমরা দ্রবণ, সাসপেনসন ও অসমস্বত্ব মিশ্রণের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছ কি? অসমস্বত্ব মিশ্রণে উপকরণগুলো খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায় ও আলাদা করা যায়। সাসপেনসনের ক্ষেত্রে উপকরণগুলো চিহ্নিত করা গেলেও সহজে আলাদা করা যায় না আর দ্রবণের ক্ষেত্রে উপকরণগুলো চিহ্নিতও করা যায় না, সহজে আলাদাও করা যায় না।

এবার আসা যাক কলয়েডের কথায়। সাসপেনসনের বেলায় আমরা দেখলাম, একটি উপকরণের ছোটো ছোটো কণাগুলো ভাসমান অবস্থায় থাকে কিন্তু অনেকক্ষণ রেখে দিলে তা তলানি হিসেবে জমা পড়ে। কিন্তু এমন কি হতে পারে না যে, কণাগুলো এতই ক্ষুদ্র ও হাল্কা যে তারা কখনই পাত্রের তলায় জমা হতে পারবে না, সব সময়ই ভাসমান বা সাসপেন্ডেড অবস্থায়ই থাকবে? হ্যাঁ অবশ্যই পারে, আর সে ধরনের মিশ্রণ যেখানে অতি ক্ষুদ্র কোনো বস্তুকণা অপর বস্তুকণার মাঝে সাসপেন্ডেড বা ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং রেখে দিলে কখনই কোনো তলানি পড়ে না তাকে বলা হয় কলয়েড।
কলয়েডে বিদ্যমান উপাদানগুলো একটি আরেকটিতে দ্রবীভূত হয় না, কিন্তু ছড়িয়ে থাকে। কলয়েডে যেটি প্রধান উপদান বা পরিমাণে বেশি থাকে, তাকে বলে অবিচ্ছিন্ন ফেজ বা দশা আর যেটি কম পরিমাণে থাকে বা ছড়িয়ে থাকে, তাকে বলে ডিসপারসড ফেজ বা দশা। যেমন: দুধ হচ্ছে একটি কলয়েড, যা পানি ও চর্বি দিয়ে তৈরি। চর্বির ক্ষুদ্র কণাগুলো পানিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে ঠিকই দেখা যায়। চিত্র-৮.৭ এ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পাওয়া দুধের একটি ছবি দেখানো হলো।

দুধের মতো কুয়াশা হচ্ছে আরেকটি কলয়েড, যেখানে পানির ছোটো ছোটো কণাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। আবার আমাদের অতি পরিচিত অ্যারোসলও কিন্তু এক ধরনের কলয়েড, যেখানে তরল কীটনাশকের কণাগুলো বাতাসে ভেসে থাকে। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে কলয়েড তৈরির জন্য ভাসমান ক্ষুদ্র কণাগুলোর আকার কত ছোট হতে হবে? সাধারণত কলয়েডে বিদ্যমান ভাসমান কণাগুলোর আকার ১-১০০০ ন্যানোমিটার হয়ে থাকে। আর যদি কণাগুলোর আকার ১ মাইক্রোমিটার বা তার বেশি হয়, তখন এটি আর কলয়েড না হয়ে সাসপেনসনে পরিণত হয়।

এই অধ্যায়ে আমরা যা শিখলাম
• একের অধিক বিশুদ্ধ পদার্থ মিশালে মিশ্রণ তৈরি হয়।
• দ্রবণসমূহ এক বিশেষ ধরনের মিশ্রণ, যেখানে দ্রব দ্রাবকে সুষমভাবে বিন্যস্ত থাকে ও একটিকে অপরটি থেকে খুব সহজে আলাদা করা যায় না।
• অসমসত্ত্ব মিশ্রণে উপাদানগুলি মিশ্রণের সর্বত্র সুষমভাবে বিন্যস্ত থাকে না এবং একটিকে অপরটি থেকে খুব সহজে আলাদা করা যায়।
• দ্রবণে যে উপাদানটি বেশি পরিমাণে থাকে ও দ্রবীভূত করে সেটি হলো দ্রাবক আর যে উপাদানটি কম পরিমাণে থাকে ও দ্রবীভূত হয় সেটি হলো দ্রব।
• সমপরিমাণ দুটি দ্রবণের মধ্যে যেটিতে দ্রবের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে তার ঘনমাত্রা বেশি হয়। সম্পৃক্ত দ্রবণে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের দ্রাবক সর্বোচ্চ যে পরিমাণ দ্রব দ্রবীভূত করতে পারে, সেই পরিমাণ দ্রব দ্রবীভূত থাকে।
• ১০০ গ্রাম দ্রাবকে কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় একটি দ্রবের সম্পৃক্ত দ্রবণ তৈরি করতে যতটুকু দ্রবের প্রয়োজন হয়, তাকেই ঐ তাপমাত্রায় ঐ দ্রাবকে ঐ দ্রবের দ্রবণীয়তা বলে।
• তাপ দিলে কোনো কোনো দ্রবের দ্রবণীয়তা বাড়ে আবার কোনো কোনো দ্রবের দ্রবণীয়তা কমে।
• পরিস্রাবণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে তরল ও কঠিন পদার্থের অসমস্বত্ব মিশ্রণ থেকে উপাদানসমূহকে আলাদা করা যায়।
• তাপের প্রভাবে তরল পদার্থকে বাষ্পে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে বাষ্পীভবন বলা হয়।
• ঘনীভবন হলো বাষ্পকে শীতল করে তরলে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
• সাসপেনসন হলো এমন একটি মিশ্রণ, যা রেখে দিলে উপাদানসমূহ আংশিকভাবে আলাদা হয়ে যায়।
• কলয়েড এক ধরনের মিশ্রণ, যেখানে একটি উপাদানের ক্ষুদ্র কণা অন্য উপাদানে ছড়িয়ে থাকে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...